স্নিগ্ধা পপি হালদার ।।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত’র রাজসভায় নবরত্নের কথা আমরা সবাই জানি। তারা ছিলেন কালিদাস, বেতাল ভট্ট,বরাহ-মিহির, বররুচি,অমর সিংহ,ধন্বন্তরি, খপনাক, শঙ্কু আর
হরিসেনা। এর মধ্যে বরাহ-মিহির ছিলেন বেশ জটিল ব্যক্তি। কেউ বলেন বরাহ এবং মিহির
হলেন বাবা-ছেলে, কেউ বলেন একই ব্যক্তি। যাই হোক, ইনি বা ইনারা ছিলেন, অঙ্ক,
জ্যোতিষ এবং মহাকাশ বিদ্যায় পারদর্শী। পঞ্চসিদ্ধান্তিকা এবং
বৃহত সংহিতা দুই মোটা বই এদের লেখা।
গল্পের খনা এই মিহিরের স্ত্রী। আর
একদম বঙ্গজ। বারাসাত এর দেউলি গ্রামে জন্ম। বিদ্যাধরী নদীর পারে চন্দ্রকেতুগড়ে
খনার নামে একটা ঢিপি আছে। বৌমার গননা শ্বশুর মশাই কে ছাপিয়ে গেলে, পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ, তাকে নীরব করে দেয়। জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী নারী যিনি বচন রচনার
জন্যেই ফেমাস, মূলত ভবিষ্যতবাণী গুলোই খনার বচন
নামে বহুল পরিচিত, তার জিভ কেটে
নেওয়া হয়।
মনে করা হয় ৮০০ থেকে ১২০০
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে খনার আবির্ভাব হয়েছিল। কিংবদন্তি অটনাচার্য ছিলেন খনার বাবা।
খনার একটি বচনে এই পরিচয় পাওয়া যায়।
“ আমি অটনাচার্যের
বেটি,
গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি”।
নীরব হওয়ার আগেই অবশ্য এই মহান
নারী আমাদের সমাজ-সভ্যতাকে এক বিশাল জ্ঞান ভাণ্ড দিয়ে গেছিলেন, আর তার অমৃত রসসুধা পান করে আমরা বাঙালীরা আজও আনন্দ পাই।
সংসারের রিসোর্স ব্যবহারের তার এই
চরম উক্তি-
'থাকলে বলদ না করে চাষ
তার দুঃখ বারো মাস।'
আপনারাও একটু ঝালিয়ে নিন। অনেকেই
এরকম অনেক কিছু জানেন যা খনার বচন নামেই পরিচিত।
যদি বর্ষে মাঘের শেষ
ধন্য রাজার পুণ্য দেশ। — এখন তো অগ্রহায়নে বৃষ্টি হচ্ছে।
এক লোকগাথা অনুসারে খনা’র আসল নাম লীলাবতী। জন্ম শ্রীলঙ্কা’তে। বিয়ে হয়েছিল মিহিরের সাথে। লীলাবতীর নামে যে গণিত
শাস্ত্রের বই পাওয়া যায়, তাতে খনার ছাপ
স্পষ্ট। ছোট ছোট সূত্রে তিনি গণিতের মূল কথা গুলো বলেছিলেন।
“অঙ্কস্য বামা গতি” অর্থাৎ অঙ্ক দক্ষিণ থেকে বাম দিকে গণণা করতে হবে।
সেই জিভ টিকটিকি খেয়ে নিয়েছিল বলে
গল্প চালু আছে। তাই কোনো কথায় টিকটিকির টিক টিক শোনা গেলে সেই কথা সত্যি হয় বলে
ভাবা হয়। জিভ্ কাটাটা ঠিক, তবে আমাদের এই
খনা খাঁটি বাঙালী।
প্রশ্ন একটা থেকেই যায়, খনা যদি সিংহলের কন্যা হয়েই থাকেন, এবং উজ্জয়নীতে শ্বশুরবাড়ী হয়, তবে বচন গুলো বাংলায় লিখলেন কি করে ? সিংহলে বা উজ্জয়নীতে তো বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল না। যদিও কোনো প্রমান নেই, তবে মনে করা হয়, খনা গণিত শাস্ত্রের বইতে যে ভাবে ছোট ছোট সূত্র লিখেছিলেন, সেই ভাবেই সংস্কৃতে এই বচন গুলো লিখেছিলেন। পরে সে গুলো
বাংলায় অনুবাদ করা হয়। বাংলায় অনুবাদ, চর্যাপদের আগেই হয়েছিল বলে মনে হয়। খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্ব ভিত্তিক ছড়া।
অজস্র খনার বচন যুগ যুগান্তর ধরে গ্রাম বাংলার জন জীবনের সাথে মিশে আছে। এই রচনা
গুলো চার ভাগে বিভক্ত।
কৃষিকাজের প্রথা ও কুসংস্কার, কৃষিকাজ ফলিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, আবহাওয়া জ্ঞান আর শস্যের যত্ন সম্পর্কিত উপদেশ।
কয়েকটি খনার বচন:-
১) মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছে তথায় যা
২) ডাকে পাখী, না ছাড়ে বাসা, খনা বলে, সেই তো ঊষা
৩) ভরা থেকে শূন্য ভালো যদি ভরতে
যায় ।
আগে থেকে পিছে ভালো যদি ডাকে মায়
।।
৪) যদি বর্ষে কাতি, রাজা বাঁধে হাতি ( কার্তিক মাসে বৃষ্টি হলে ফসল ভালো হয়)
যদি বর্ষে আগনে, রাজা নামে মালা হাতে মাগনে।(অগ্রহায়নে বৃষ্টি হলে ফসলের
ক্ষতি)
যদি বর্ষে পৌষে, কড়ি হয় তুষে।( ধানের দানা বা চাল হবে না শুধু তুষ হবে)
যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুন্য দেশ।
৫) যদি অশ্বি কুয়া ধরে, তবে ধানগাছে পোকা ধরে -কুয়া মানে কুয়াশা। আশ্বিন মাসে
কুয়াসা হলে ধানে ধসা রোগ হয়।
৬) কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত। কলা গাছের পাতা কাটলে পাতুড়ি হয় বটে কিন্তু তাতে কলার সাইজ আর
সংখ্যা কমে যায়।
৭)আশ্বিনের উনিশ , কার্তিকের উনিশ
বাদ দিয়ে মটর কলাই বুনিস
খনার বচন না যদি ধর
চাষার বেটা বুক চাপরে মর।
অর্থঃ- আশ্বিনের উনিশ তারিখ থেকে
কার্তিকের উনিশ তারিখ পর্যন্ত সময়ে মটর কলাই বপন না করলে ভালো ফল হয় না।
৮) খনা'র বচনঃ
ঘন সরিষা বিরল তিল।
ডেঙ্গে ডেঙ্গে কাপাস।।
এমন করে বুনবি শন।
না লাগে বাতাস।।
অর্থঃ- সরিষা বুনতে হবে খুব ঘন
করে,
আর তিল বুনতে হয় পাতলা করে। 'ডেঙ্গে ডেঙ্গে কাপাস' মানে এক কদম
দূরে দূরে কার্পাস লাগাতে হয়।আর শন (শন থেকে সুতা হয়) এত ঘন করে বুনতে হয় যেন
ভিতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। অন্য এক বচনে বলা হয়েছে এভাবে- 'পাতলা তিল, ঘন সরিষা। ফলে
বেশি পুরায় আশা।'
৯)পুবে আফাল বায় বান।
দখনে আফাল খায় ধান। (আফাল= দমকা
হাওয়া)
অর্থঃ- পূর্ব থেকে প্রবাহিত দমকা
বাতাস বন্যার লক্ষন। দক্ষিণ দিক থেকে দমকা হাওয়া ধান নষ্ট করে।
১০) "অকালে কুয়াশা
সকালে বৃষ্টি।।
চৈতে কুয়াশা ভাদ্রে বান।
সেই বর্ষে মড়ক জান।।"
অর্থঃ- অকালে কুয়াশা হলে সেবছর
সম্ভাব্য সময়ের আগেই বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে। চৈত্র মাসে কুয়াশা হলে চৈত্রের
প্রখর রোদে রোগ জীবাণু বিনষ্ট হয় না। ফলে মহামারী দেখা দেয়।
ভাদ্র মাসে বন্যা হলে মহামারী
দেখা দেয়,
এ দেশবাসী তা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছে।
১১ ) খনার বচনঃ
যত জ্বালে ব্যঞ্জন মিষ্ট
তত জ্বালে ভাত নষ্ট
অর্থঃ সবাইকে এক পাল্লায় মাপা
অনুচিত। মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী তার সাথে ব্যাবহার করতে হয়।
১২ ) অক্ষর দ্বিগুণ চৌগুণ মাত্রা, নামে নামে করি সমতা। তিন দিয়ে হরেয়ান তাহে মরে বাচাধন, একে শূন্য মরে পতি দুই থাকিলে মরে যুবতী।
১২) শনির সাত, মঙ্গলের তিন আর সব দিন দিন। কোন দিনে বৃষ্টি শুরু হলে কতদিন
ধরে এক নাগাড়ে চলে তাই নিয়ে লেখা
ওয়েদার ফোরকাস্টের একটা চরম
উদাহরনঃ
কোদালে কুড়ুলে মেঘের গায়ে, মধ্যে মধ্যে দিচ্ছে বায়
শ্বশুর কে বল বাঁধতে আল, বৃষ্টি হবে আজ কি কাল।- ছোটো ছোটো মেঘ, আর বাতাস বইলে বৃষ্টি হবে।
এই বচন শুনে মনে হয় সাধারণ গ্রাম
বাঙলার মেয়ে ছিলেন উনি। কারণ বরাহমিহির কি আল বাঁধবেন কি বাঁধাবেন..?? কোদালে মেঘে অবশ্যই বৃষ্টি হবে ৭২ ঘন্টার মধ্যে। নাবিকরা
সমুদ্রযাত্রা কালে ঐ মেঘ দেখে ভয় পেত।
'পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ
উত্তরে কলা, দক্ষিণ খোলা'
এটা খনার বাস্তুশাস্ত্র। পূর্ব
দিকে হাঁস, মানে পুকুর থাকা ভালো। পশ্চিমে
বাঁশ ঝাড়। উত্তরে কলার ঝাড় শীতের উত্তুরে হাওয়া আটকাবে, আর দখিনা বাতাসের জন্য দক্ষিণ খোলা রাখা বাঞ্ছনীয়। যুক্তির
হিসেবে শুধু নয়, এতে গৃহস্থকে অর্থনৈতিকভাবে
স্বাবলম্বী হবার উপদেশও দেওয়া গেল। কলাচাষ অর্থকরী, নানা মাঙ্গলিক ক্রিয়া কর্মে কলা লাগে। বাঁশ খুবই অর্থকরী ও প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ।
হাঁস প্রতিপালন যেমন পুষ্টির ( ডিম কষার ছবি ফেস বুকে ভর্তি) নিশ্চয়তা দেয়, তেমনি ডিম বিক্রিও করা যায়। সাথে পুকুরের সুবিধে তো আলাদা
করে বলার প্রয়োজন নেই।
খনা শুধু অত্যন্ত বুদ্ধিমতীই
ছিলেন না,
নিজের মেধাকে মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে সহজ সরলভাবে
ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। ব্যাপারটি যে সে সময়ের নিরিখে কার্যকরী ও জনপ্রিয় হয়েছিল, তা আজও তাঁর প্রাসঙ্গিকতাতেই প্রমাণিত।
উত্তর চাপা আর দক্ষিণ খোলা
ব্যাপার টা কনভেনশানাল বাস্তু শাস্ত্র মতের ঠিক উলটো। সেখানে বলা হয় দক্ষিণ চাপা ও
উত্তর খোলা হওয়া উচিত। এখানেই আসে জ্যোতিষ শাস্ত্রের স্থান, কাল ও পাত্রের খেলা। বঙ্গদেশের জন্যে খনার কথাই উপযুক্ত।
আবার দেখুন -
দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা।
পূব দুয়ারী তাহার প্রজা।
পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই।
উত্তর দুয়ারীর কথা নাই
দিনে রোদ আর রাতে জল
দিনে দিনে বাড়ে ধানের বল--
সারারাত বৃষ্টি আর সারাদিন রোদ --স্বাভাবিক ভাবেই গাছের ভালো ফলন ও বৃদ্ধি হবে। এই
একই নিয়ম উত্তর বঙ্গে চা বাগানেও দেখতে পাওয়া যায়।
খনা ডাকিয়া কন,
রোদে ধান, ছায়ায় পান।-পান বরজে হয়।
বামুন বাদল বান
দক্ষিনেতেই যান। - মানে ব্রাহ্মণ
দক্ষিনা পেলে তবেই মুক্তি, বাদল আর বানের
জল দক্ষিণ দিকে বইলে তবেই কমে।
জৈষ্ঠ্যতে তারা ফুটে
তবে জানবে বর্ষা বটে
'সবল গরু, গভীর চাষ
তাতে পুরে চাষার আশ'
বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা!
সকাল শোয়, সকাল ওঠে, তার কড়ি না
বৈদ্য লুটে। আর্লি টু রাইজ… সেই অন্যায় আবদার।
শূন্য কলসী , শুকনো না(নৌকা)
শূন্য ডালে ডাকে কা(কাক)
পিছন থেকে দেয় ডাক
এক পা ও না আগাস বাপ ! —— এটা অনেকটাই কুসংস্কার
ঘোল, কুল, কলা তিনে নাশে
গলা
উঠান ভরা লাউ শসা, ঘরে তার লক্ষীর দশা
ডাক ছেড়ে বলে রাবণ, কলা রোবে আষাঢ় শ্রাবণ
এক পুরুষে রোপে তাল
অন্য পুরুষ করে পাল
তারপর যে সে খাবে
তিন পুরুষে ফল পাবে——— এগ্রো ইকোনমির গল্প
দুগ্ধ শ্রম গংগা বারি, এই তিন উপকারী
তাল তেঁতুল বাবলা
কী করবে দুধুমুখী একলা
যে বাড়িতে ঐ তিনটি গাছ একসাথে
থাকে,
দুধুমুখী মানে সম্পন্ন গেরস্থলীর বিপদ আসন্ন কিন্তু কেন? তাল গাছ যথেষ্ট লাভ দায়ক। তেঁতুল ও তাই। বাবলা টা এক
অপদার্থ! কম্বিনেশন বেশ খটোমটো। সম্ভবতঃ বিষধর সাপের আবাসস্থল
আরও কয়েকটি -
নরা গজা বাঁচে শয়
তার অর্ধেক বাঁচে হয়(ঘোড়া)
বিশে গরু দশে ছাগলা
তার অর্ধেক বরাপাগলা !
পাঁচ শনি মীনে(চৈত্রে) পায়
ঝরা কিংবা খরায় যায় !
পাঁচ শনি পায় মীনে
শকুন মাংস না খায় ঘৃণে
ষোলো চাষে মূলা
তার অর্ধেকে তুলা
তার অর্ধেকে ধান
বিনাচাষে পান
যদি বর্ষে পৌষে/কড়ি হয় তুষে
যদি বর্ষে চোতের কোণা/ হেলে বৌয়ের
কানে সোনা
আগে হাঁটে সাপটে খায়
গাং গড়ানে গড়ায় যায়
তারে নিতে যমও ডরায়
অল্প জলের মাছ
করে ছলাৎ ছলাৎ।
নিজের বেলায় আটিশুটি
পরের বেলায় চিমটি কাটি ।
নদী ধারে পুঁতলে কচু।
কচু হয় তিন হাত উঁচু।
পশ্চিমে ধনু নিত্য খরা।
পুবের ধনু বর্ষে ধারা।
নারিকেল গাছে নুনমাটি।
শীঘ্র শীঘ্র বাঁধে গুটি।।
দূর সভা (চন্দ্র সভা) নিকট জল।
নিকট সভা দূর জল (বৃষ্টি )।
একশ বিঘে কলা রুয়ে থাকবে চাষী
মাচায় শুয়ে
খেটে খাটায় দ্বিগুন পায়
বসে খাটায় একগুন পায়
ঘরে বসে শুধু বাত ( গ্যাস)
তার কপালে নেইকো ভাত
খনা বা ক্ষণা যদি বরাহমিহিরের
পুত্রবধু সত্যিই হয়ে থাকেন তাহলে তাঁর সময়কাল মোটামুটি ৪০০ খ্রীষ্টাব্দ। সে সময়ের
রচনা হয় সংস্কৃতে হবে নয়ত মাগধী প্রাকৃতে হবে। কারন বাংলাভাষার তখনো উদ্ভব হয়নি।
সংস্কৃতে বা প্রাকৃতে এই বচনের কোন কাউন্টারপার্ট নেই। এমনকি ৭০০-৮০০ শতকের
প্রাকৃত ভাষাতেও নেই। আছে শুধুই বাংলায়। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে খনা
সম্পর্কে।
আমার মনে হয় খনা মধ্যযুগের
বাংলার একজন মহিলা জ্যোতিষী যাঁর বচনগুলো বিখ্যাত আর চিরস্থায়ী করার জন্য
বরাহমিহিরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে এক কল্পকাহিনী রচনা করা হয়েছে।
অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি
ছিলেন সিংহলরাজের কন্যা। উজ্জয়নীর রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ সভার প্রখ্যাত
জোতির্বিদ বরাহপুত্র মিহির ছিলেন খনার স্বামী। বরাহ তার পুত্রের জন্ম কোষ্ঠি গনণা
করে পুত্রের আয়ু এক বছর দেখতে পেয়ে শিশু পুত্র মিহিরকে একটি পাত্রে করে সমুদ্র
জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌছলে সিংহলরাজ শিশুটিকে লালন
পালন করেন এবং পরে কন্যা খনার সাথে বিয়ে দেন। খনা এবং মিহির দু'জনেই জ্যোতিষশাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। অনুমান,বরাহের প্রয়াণের পর মিহির একসময় বিক্রমাদিত্যের সভাসদ হন।
একদিন পিতা বরাহ এবং পুত্র মিহির আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পরলে, খনা এ সমস্যার সমাধান দিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেন। গণনা করে খনার দেওয়া পূর্বাভাস রাজ্যের কৃষকরা উপকৃত হতো বলে রাজা
বিক্রমাদিত্য খনাকে দশম রত্ন হিসেবে আখ্যা দেন। রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে
প্রতিহিংসায় বরাহের আদেশে মিহির খনার জিভ কেটে দেন। এর কিছুকাল পরে খনার মৃত্যু
হয়।
খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক
ছড়া। আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত। অনেকের মতে, খনা নাম্নী জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী বাঙালি
নারীর রচনা এই ছড়াগুলো। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অজস্র খনার বচন যুগ-যুগান্তর ধরে
গ্রাম বাংলার জন-জীবনের সাথে মিশে আছে।
আরেক সোর্স বলছে লীলাবতী
ভাষ্করাচার্য-২ এর কন্যা। বাল বিধবা। বাবার সাথে বৈদিক অঙ্ক প্র্যাক্টিস করে। বাপ
বেটির কালেকশনের নাম লীলাবতী, সেটাও আবার
অংকের বই। খৃষ্ট পূর্ব ৩০০ সালের গ্রীক গনিতজ্ঞ ইউক্লিডের ১৩ খন্ডের (Στοιχεῖα Stoicheia) এলিমেন্টের পরে দ্বিতীয় প্রাচীন বই।
ইতিহাস এবং মিথ মিলে এখন ও কিছু
ধোঁয়াশা থেকে গেল। বঙ্গ ললনা খনা যদি ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিঃ র মধ্যে জন্ম গ্রহন করেন, তবে তিনি গুপ্ত যুগের নবরত্ন বরাহ -মিহিরের সমসাময়িক হতে
পারেন না। গুপ্ত যুগ তার অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছিল। ৮০০-১২০০ সালে বাংলা তখন খিলজির
দৌরাত্ম উপভোগ করছিল। খনার বচন মুলত প্রাক চর্যাপদ যুগের হলেও এতে ধর্ম বা ভক্তি
কোনটাই নেই।
ফেসবুক থেকে

0 Comments